

স্টাফ রিপোর্টার, সুমাইয়া আক্তার।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ইউনিয়নের কানারটেক এলাকা—নামেই যেন বাস্তবতার প্রতিফলন। কাগজে-কলমে পুনর্বাসনের নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে এখানে বসবাসরত প্রায় ৪৫টি অন্ধ পরিবার এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। অভিযোগ রয়েছে, অন্তত ৩০ জন দৃষ্টিহীন ব্যক্তি প্রতিদিন ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, কানারটেক যেন এক নীরব বঞ্চনার জনপদ। সুরুজ মিয়া, আব্দুস সাত্তারসহ অনেকেই জন্মান্ধ কিংবা সময়ের সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। স্থায়ী আয়ের কোনো সুযোগ না থাকায় জীবিকার তাগিদে তাদের বড় একটি অংশ ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এলাকাবাসী জানান, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই এলাকায় পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো। গরমে চরম দুর্ভোগ, আর রাত নামলেই নেমে আসে অনিরাপত্তার অন্ধকার। দৃষ্টিহীনদের জন্য চলাচল হয়ে পড়ে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
শিক্ষা খাতেও চরম অবহেলা—এলাকায় নেই কোনো স্কুল বা মাদ্রাসা। ফলে শিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “দেশের প্রায় সব জায়গায় স্কুল আছে, কিন্তু আমাদের কানারটেকে এখনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি।”
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এলাকাটির প্রবেশমুখে টাঙানো সাইনবোর্ডে “মহামান্য হাইকোর্টের রিট পিটিশনের আদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতি কর্তৃক পুনর্বাসন” উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন নেই।
দলিলপত্র বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০০২ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সরকারি খাস জমিতে ভূমিহীন অন্ধ ও ছিন্নমূল পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের প্রস্তাবও উত্থাপন করা হয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুপারিশও রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
বাংলাদেশ অন্ধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির দাবি, ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন দপ্তরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। তবুও দুই দশকেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় হতাশা বাড়ছে ভুক্তভোগীদের মধ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্বাস এলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। ফলে একই অনিশ্চয়তায় ঘুরপাক খাচ্ছে কানারটেকের অন্ধ পরিবারগুলোর জীবন।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিতকরণ, দৃষ্টিহীনদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হোক।
মানবিক সংকটের এই দীর্ঘ চিত্র শুধু একটি এলাকার বাস্তবতা নয়—এটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কাগজের প্রতিশ্রুতি পেরিয়ে বাস্তবের আলো কবে পৌঁছাবে কানারটেকে।
স্টাফ রিপোর্টার: সুমাইয়া আক্তার