

মোঃইসমাইল হোসাইন, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের খোছাবাড়ী ও রাঙ্গামাটি এলাকায় ওয়াপদা বাঁধের দুই পাশে দীর্ঘদিন পতিত থাকা প্রায় দুই কিলোমিটার জায়গাজুড়ে লাউ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন ছয় উদ্যোক্তা। অকেজো পড়ে থাকা জমিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা এই লাউয়ের ক্ষেত ইতোমধ্যে স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ।
উদ্যোক্তারা হলেন মো. শাহাদাত হোসেন, মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন, জিয়াউর রহমান, আশরাফুল আলম, মফিজুল হক ও মো. হাকিম। তাঁরা সম্মিলিতভাবে বাঁধের দুই পাশের পতিত জমিতে বাঁশের মাচা তৈরি করে বিভিন্ন জাতের লাউয়ের চারা রোপণ করেন। জমি প্রস্তুতিতে ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও জৈব সার ব্যবহার করা হয়েছে। মাচা তৈরি ও ক্ষেত পরিচর্যায় প্রতিদিন পাঁচ থেকে আটজন স্থানীয় শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন, যাঁদের দৈনিক মজুরি চারশ টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধের দুই পাশজুড়ে সারি সারি মাচা থেকে ঝুলছে অসংখ্য লাউ। কোথাও শ্রমিকরা ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত, আবার কোথাও চলছে পরিপক্ব লাউ সংগ্রহের কাজ। ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিক রহিম উদ্দিন (৪৫) বলেন, “আগে এই বাঁধে কোনো কাজ ছিল না। এখন লাউ ক্ষেতে কাজ করে সংসার ভালোভাবে চলছে। পতিত জায়গাটা এখন অনেকের রিজিকের ব্যবস্থা করেছে।”
উদ্যোক্তারা জানান, সম্পূর্ণ নিজেদের সঞ্চিত অর্থে তাঁরা এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, কোনো ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নেননি। এ পর্যন্ত লাউ চাষে তাঁদের ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। উৎপাদিত লাউ স্থানীয় বাজারসহ পার্শ্ববর্তী শহরের বাজারেও বিক্রি শুরু হয়েছে এবং এ পর্যন্ত আনুমানিক সাড়ে তিন লাখ টাকার লাউ বিক্রি হয়েছে বলে জানান তাঁরা।
বর্তমানে বাজারে প্রতি পিস লাউ পাইকারি পঁচিশ থেকে ত্রিশ টাকা এবং খুচরা বাজারে চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে মোট সাত লাখ টাকার লাউ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন উদ্যোক্তারা। সরকারি ওয়াপদা বাঁধের জায়গায় সবজি চাষ হলেও স্থানীয় প্রশাসন এতে কোনো বাধা দেয়নি, বরং উৎসাহ জুগিয়েছে বলে জানা গেছে।
উদ্যোক্তারা আরও জানান, শুধু লাউ নয়, একই জমিতে সাথি ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যান্য সবজি চাষেরও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের, যাতে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি আয়ও বাড়ানো সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে সাথি ফসলের চাষ শুরু হলে আরও বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে উদ্যোক্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, “পতিত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে কিছু করার চিন্তা থেকেই আমরা ছয়জন মিলে নিজের জমানো টাকায় লাউ চাষ শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো লাউ বিক্রি হয়েছে। আশা করছি ভালো দাম পেলে আরও লাভবান হব। ভবিষ্যতে চাষের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, তবে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে কাজটি আরও সহজ হতো।”
স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, “পতিত জায়গায় সবজি চাষের মাধ্যমে একদিকে জায়গার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ছে। সঠিক পরিচর্যা, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এ ধরনের উদ্যোগ থেকে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।”
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময়ের অকেজো জায়গা এখন সবুজ ফসলের সমারোহে পরিণত হয়েছে। ছয় উদ্যোক্তার এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা কেবল তাঁদের নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি করছে না, বরং এলাকায় নতুন কর্মসংস্থান ও সবজি উৎপাদনের সম্ভাবনাও উন্মোচন করে
মোঃইসমাইল হোসাইন, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: