মোঃ হারুন অর রশিদ,উখিয়া প্রতিনিধি (কক্সবাজার)
কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীতে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেছেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা। শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে পালংখালী স্টেশন চত্বরে মানববন্ধন শেষে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। সড়কের উভয় পাশে প্রায় তিন ঘণ্টাধরে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় সাধারণ যাত্রীরা বিপাকে পড়ে।
‘প্রতারকের বিচার চাই,আমাদের টাকা ফেরত চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পালংখালী স্টেশন এলাকা। কয়েকশ নারী-পুরুষ গ্রাহক মানববন্ধন ও অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এ সময় অনেক গ্রাহক কান্নায় ভেঙে পড়ে দ্রুত তাঁদের কষ্টার্জিত আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ,পালংখালী বাজারে অবস্থিত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় দীর্ঘদিন ধরে টাকা জমা করে আসছিলেন তারা। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে শাখার সংশ্লিষ্টরা নানা অজুহাতে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হিসাব ও জমার রসিদ যাচাই করে অনেক গ্রাহক তাঁদের হিসাবে জমা করা টাকার সঙ্গে প্রকৃত জমার মিল না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া গ্রাহকেরা বলেন,আমাদের কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে জমা রেখেছি। এখন প্রয়োজনের সময় সেই টাকা পাচ্ছি না। দ্রুত টাকা ফেরত দিতে হবে। যারা গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত,তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
মামলার বাদী ও পালংখালী বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বলেন আমার নিজের হিসাবেই ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে লেনদেন করেছি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারি, হিসাবে জমা করা টাকার সঙ্গে মিল নেই। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
গ্রাহক আমিরুল ফয়েজ বলেন,আমি দীর্ঘদিন ধরে ওই এজেন্ট শাখায় টাকা জমা করে আসছি। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে নানা অজুহাতে আমাকে টাকা দেওয়া হয়নি। পরে হিসাব ও জমার রসিদ যাচাই করে দেখি, আমার জমা করা টাকার সঙ্গে হিসাবে থাকা টাকার মিল নেই। আমরা চরম দুশ্চিন্তায় আছি। আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
গ্রাহক রুনা আক্তার বলেন,বিশ্বাস করে ব্যাংকের ওই এজেন্ট শাখায় টাকা জমা রেখেছিলাম। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারি, আমার হিসাবে জমা করা পুরো টাকা নেই। বারবার যোগাযোগ করেও সমাধান পাইনি। আমরা সঠিক হিসাব যাচাই করে প্রত্যেক গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
আরেক গ্রাহক খতিজাতুল কোবরা বলেন,আমি ওই এজেন্ট শাখায় ১০ লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ি। পরে জানতে পারি, আমাদের মতো আরও অনেক গ্রাহকের টাকাও আটকে আছে। আমরা আমাদের জমা করা টাকা ফেরত চাই। একই সঙ্গে যারা এ ঘটনায় জড়িত, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
মানববন্ধনের একপর্যায়ে মাংস ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁর দাবি,ওই এজেন্ট শাখায় তাঁর ৯ লাখ টাকা জমা রয়েছে।
রাশেদা বেগম নামে এক গ্রাহক বলেন,আমার কষ্টার্জিত প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যাংকে জমা ছিল। এখন সেই টাকা নেই। আমি খুব অসহায় হয়ে পড়েছি। আমার মতো সাধারণ মানুষের টাকা যেন ফেরত দেওয়া হয়।
জাফর আলম বলেন,মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যাংকে জমিয়েছিলাম। এখন সেই টাকা না পেলে মেয়ের বিয়ে কীভাবে দেব, তা জানি না। আমরা দ্রুত আমাদের টাকা ফেরত চাই।
গ্রাহকেরা অভিযোগ করেন, শুধু মামলায় উল্লেখ করা ২১ জনের ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা নয়, ওই এজেন্ট শাখায় আরও বহু গ্রাহকের কয়েক কোটি টাকা আটকে রয়েছে। তাঁদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রত্যেক গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে হবে।
এদিকে, গ্রাহকদের সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। যান চলাচল স্বাভাবিক করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলেন ও অবরোধ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ রিপোর্ট লিখাকালিন সময় সড়ক অবরোধ তুলে নেওয়া হয়নি। সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ গাড়ি লাইন দেখা যায়।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার পর দুজনকে আটক করা হয়েছে। আজকের মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধের বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বিকাল ৫টার দিকে সড়ক অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, মামলায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন, ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলাম, ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদসহ নয়জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ আত্মসাৎ, হিসাবের নথি ও জমার রসিদে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২১ গ্রাহকের হিসাবে মোট ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা জমা ছিল।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন ও ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলামকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরে পুলিশ তাঁদের হেফাজতে নেয়। পরে গ্রাহক আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় নয়জনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, “উপজেলার পালংখালী বাজার এলাকার আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট শাখা থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানতে পেরেছি। বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে অবগত করা হয়েছে। যাতে গ্রাহকরা তাদের আমানত ফেরৎ পায়।
তবে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের প্রকৃত পরিমাণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত,তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।